বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার স্বপ্ন যাঁদের, তাঁদের জন্য পাসপোর্টের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বিএমইটি (BMET) রেজিস্ট্রেশন। অনেকে একে চেনেন জনশক্তি কার্ড, ম্যানপাওয়ার কার্ড বা স্মার্ট কার্ড নামে। এই নিবন্ধন ছাড়া আপনি বৈধভাবে বিদেশ গমনের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স পাবেন না।
আগে এই কাজের জন্য দালাল বা এজেন্সির পেছনে ঘুরতে হতো। এখন ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ ছাড়াও সরকারের নতুন সার্ভার/পোর্টালের মাধ্যমে ঘরে বসেই মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে নিজে নিজে রেজিস্ট্রেশন করা যায়। এই গাইডে আমরা ধাপে ধাপে দেখব ২০২৬ সালের নতুন নিয়মে কীভাবে BMET রেজিস্ট্রেশন করবেন, ফি কত, কী কী কাগজ লাগবে এবং কার্ড কীভাবে ডাউনলোড করবেন।

বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন কী এবং কেন প্রয়োজন
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (Bureau of Manpower, Employment and Training – BMET) এর ডেটাবেজে আপনার নাম অন্তর্ভুক্ত করাই হলো বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন। সংক্ষেপে এর প্রয়োজনীয়তা:
- নিবন্ধনের পর নির্দিষ্ট টিটিসি (TTC) তে প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ (PDO) নিতে হয়।
- বিদেশ যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের জন্য বাধ্যতামূলক।
- আপনি একজন বৈধ অভিবাসী কর্মী হিসেবে সরকারি ডেটাবেজে নথিভুক্ত হন, ফলে প্রতারণা ও দালালের ঝুঁকি কমে।
- প্রবাসকালীন বিপদে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, ক্ষতিপূরণ ও কল্যাণ সুবিধা পেতে এই নিবন্ধন কাজে লাগে।
নতুন নিয়মে কী পরিবর্তন এসেছে
আগে শুধু ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করা গেলেও সেখানে ট্রেনিং শিডিউল নেওয়া যেত না। নতুন ব্যবস্থায়:
- অ্যাপের পাশাপাশি সরকারের অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ব্রাউজার থেকে নিবন্ধন করা যায়।
- পাসপোর্টের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়।
- নিজস্ব আইডি-পাসওয়ার্ড সেট করে পরে যেকোনো সময় লগইন করে তথ্য আপডেট করা যায়।
- পরবর্তীতে একই অ্যাকাউন্ট থেকে ট্রেনিং সংক্রান্ত আপডেট পাওয়া যায়।
মনে রাখবেন: ইতিমধ্যে যাঁরা নিবন্ধন করে ফেলেছেন তাঁদের নতুন করে নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই। একবার রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ সাধারণত নিবন্ধনের তারিখ থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বহাল থাকে।
রেজিস্ট্রেশনের আগে যা প্রস্তুত রাখবেন
নিবন্ধন শুরুর আগে নিচের তথ্য ও কাগজপত্র হাতের কাছে রাখুন—তাতে সময় বাঁচবে এবং ভুল কম হবে:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) – নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্ম তারিখ ও ঠিকানা মিলিয়ে নেওয়ার জন্য।
- বৈধ পাসপোর্ট – নম্বর, ইস্যু ও মেয়াদ শেষের তারিখ, ইস্যুর স্থান।
- পাসপোর্টের পরিষ্কার স্ক্যান কপি (JPG বা PDF ফরম্যাটে)।
- সক্রিয় মোবাইল নম্বর – OTP যাচাইয়ের জন্য।
- মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট (বিকাশ/নগদ/রকেট) – পর্যাপ্ত ব্যালেন্সসহ ফি পরিশোধের জন্য।
- (ঐচ্ছিক) একটি স্বাক্ষরের ছবি (প্রায় ৩০০×৮০ পিক্সেল)।
বয়সসীমা সাধারণত ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে হতে হয়।
ধাপে ধাপে নিবন্ধন প্রক্রিয়া
ধাপ ১: পোর্টালে প্রবেশ
গুগলে গিয়ে BMET/OEP-এর অফিশিয়াল পোর্টাল খুঁজুন (যেমন ep.gov.bd বা oep.gov.bd)। অফিশিয়াল সাইট চেনার জন্য সবসময় ওয়েব ঠিকানার শেষে .gov.bd আছে কি না দেখে নিন।
https://employee.oep.gov.bd/employee/registration
- যেহেতু আপনি নতুন নিবন্ধন করবেন, পেজে থাকা “একাউন্ট নেই? এখানে ক্লিক করুন / Register Now” লিঙ্কে ক্লিক করুন।
- এরপর একটি নিবন্ধন ফর্ম আসবে—সেখানে নির্দেশনা অনুসরণ করে এগিয়ে যান।
ধাপ ২: প্রাথমিক তথ্য প্রদান
ফর্মে নিচের তথ্যগুলো দিন:
- নাম – অবশ্যই NID-এর সাথে হুবহু মিলতে হবে।
- মোবাইল নম্বর – সক্রিয় যেকোনো বৈধ নম্বর।
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর।
- জন্ম তারিখ – সঠিকভাবে।
- ডিক্লারেশন বক্সে টিক দিন এবং ক্যাপচা কোড পূরণ করে “যাচাই” বোতামে ক্লিক করুন।
এরপর আপনার মোবাইলে একটি OTP (One-Time Password) পাঠানো হবে।
ধাপ ৩: OTP যাচাই ও পাসওয়ার্ড সেট
- মোবাইলে পাওয়া OTP কোডটি ফর্মে বসিয়ে লগইন সম্পন্ন করুন।
- প্রথম লগইনের পর প্রোফাইলে গিয়ে “পাসওয়ার্ড পরিবর্তন” অপশন থেকে নতুন পাসওয়ার্ড সেট করুন (একই পাসওয়ার্ড দুইবার দিয়ে নিশ্চিত করুন)।
- চাইলে একটি ইমেইল ঠিকানা যোগ করুন—পরে ইমেইল দিয়েও লগইন করতে পারবেন।
- “আপডেট” বোতামে ক্লিক করুন।
ধাপ ৪: প্রোফাইল ও পাসপোর্ট তথ্য পূরণ
প্রোফাইলে গিয়ে নিচের তথ্যগুলো সাবধানে পূরণ করুন:
ব্যক্তিগত তথ্য (NID অনুযায়ী):
- নাম, পিতার নাম, মাতার নাম (ইংরেজি ও বাংলায়, NID-এর সাথে মিল রেখে)।
- জন্মস্থান, পেশা, লিঙ্গ, রক্তের গ্রুপ, ধর্ম।
- উচ্চতা (মিটারে — যেমন ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি ≈ ১.৬৮ মিটার) ও ওজন (কেজিতে)।
- বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা (NID/পাসপোর্টের সাথে মিল রেখে)।
পাসপোর্ট তথ্য:
- পাসপোর্ট নম্বর, ইস্যুর তারিখ, মেয়াদ শেষের তারিখ ও ইস্যুর স্থান।
ফাইল আপলোড:
- পাসপোর্টের স্ক্যান কপি (JPG/PDF)।
- ঐচ্ছিকভাবে স্বাক্ষরের ছবি।
সব তথ্য মিলিয়ে নিয়ে “সংরক্ষণ করুন ও এগিয়ে যান” বোতামে ক্লিক করুন।
ধাপ ৫: ভুল হলে সংশোধন
কোনো তথ্যে ভুল থাকলে “এডিট” অপশনে গিয়ে সংশোধন করে আবার “সাবমিট” করুন। শুরু থেকেই সঠিক তথ্য দিন—কারণ সাবমিটের পর বড় ভুল সংশোধনের জন্য সরাসরি BMET অফিসে গিয়ে আবেদন করতে হতে পারে, যা সময়সাপেক্ষ ও ঝামেলার।
ধাপ ৬: ফি পরিশোধ
- নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি (সরকারি নির্ধারিত পরিমাণ; সার্ভিস চার্জ যোগ হলে সামান্য বেশি হতে পারে) পরিশোধ করতে হবে।
- “পেমেন্ট করতে এগিয়ে যান” অপশনে ক্লিক করলে সরকার-অনুমোদিত (যেমন সোনালী ব্যাংক) পেমেন্ট গেটওয়ে আসবে।
- বিকাশ/নগদ/রকেটের নম্বর দিন, OTP ও পিন ব্যবহার করে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
- পেমেন্ট সফল হলে একটি নিশ্চিতকরণ বার্তা পাবেন।
ফি বছরভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। আবেদন করার আগে পোর্টালে প্রদর্শিত হালনাগাদ ফি দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন।
ধাপ ৭: রেজিস্ট্রেশন কার্ড ডাউনলোড
পেমেন্ট সম্পন্ন হলে “রেজিস্ট্রেশন কার্ড ডাউনলোড” অপশনে ক্লিক করুন। আপনি একটি BMET Identification Number (BIDN) সহ কার্ড পাবেন। কার্ডটি PDF আকারে ডাউনলোড করে কালার প্রিন্ট করে রাখুন—এটি ট্রেনিং ও বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের সময় প্রয়োজন হবে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ট্রেনিং ও স্মার্ট কার্ড
নিবন্ধন ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে স্মার্ট/ক্লিয়ারেন্স কার্ড প্রস্তুত হয়। বিদেশ যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (TTC) বা ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজিতে প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ (PDO) নিতে হয়। ট্রেনিংয়ের শিডিউল সম্পর্কিত নোটিফিকেশন আপনি অ্যাপ বা পোর্টালে পাবেন।
বিএমইটি কার্ড যাচাই ও ডাউনলোড
রেজিস্ট্রেশন ঠিকঠাক হয়েছে কি না তা যাচাই করতে:
- ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ অথবা BMET অফিশিয়াল পোর্টালে যান।
- পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে আপনার স্ট্যাটাস ও স্মার্ট কার্ড খুঁজুন।
- কার্ডটি PDF আকারে ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন এবং প্রিন্ট কপি সঙ্গে রাখুন।
গুরুত্বপূর্ণ টিপস
কার্ড সংরক্ষণ: ডাউনলোড করা কার্ডের PDF কপি মোবাইলে ও কালার প্রিন্ট—দুটোই রাখুন।
তথ্যের সঠিকতা: NID ও পাসপোর্টের তথ্যের সাথে হুবহু মিল রেখে ফর্ম পূরণ করুন। ভুল হলে অফিসে যাওয়ার ঝামেলা পোহাতে হতে পারে।
পাসপোর্ট স্ক্যান: ফ্রেশ ও পরিষ্কার স্ক্যান কপি আপলোড করুন; ঝাপসা ছবি হলে ভেরিফিকেশন আটকে যেতে পারে।
নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট: আবেদন চলাকালে স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করুন।
পর্যাপ্ত ব্যালেন্স: পেমেন্টের জন্য বিকাশ/নগদ অ্যাকাউন্টে আগে থেকেই যথেষ্ট টাকা রাখুন।
অফিশিয়াল সাইট: শুধু .gov.bd ঠিকানার সরকারি পোর্টাল ব্যবহার করুন; দালাল বা ভুয়া সাইট এড়িয়ে চলুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: BMET রেজিস্ট্রেশন কি ঘরে বসে নিজে করা যায়? হ্যাঁ। ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ বা সরকারের অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করে মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে নিজেই করা যায়।
প্রশ্ন: রেজিস্ট্রেশনের জন্য কী কী লাগে? NID, বৈধ পাসপোর্ট, পাসপোর্টের স্ক্যান কপি, সক্রিয় মোবাইল নম্বর ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট।
প্রশ্ন: ট্রেনিং কি বাধ্যতামূলক? হ্যাঁ, বিদেশ গমনের আগে নির্দিষ্ট TTC-তে প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ (PDO) নিতে হয়।
প্রশ্ন: কার্ড কীভাবে ডাউনলোড করব? পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর পোর্টাল/অ্যাপ থেকে পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে স্মার্ট কার্ড PDF আকারে ডাউনলোড করা যায়।
প্রশ্ন: ভুল তথ্য দিলে কী হবে? সাবমিটের আগে এডিট করে ঠিক করা যায়। সাবমিটের পর বড় ভুল সংশোধনে BMET অফিসে আবেদন করতে হতে পারে, তাই শুরুতেই সাবধান থাকুন।
উপসংহার
নতুন নিয়মে BMET রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ ও স্বচ্ছ হয়েছে। দালালের পেছনে না ছুটে, NID ও পাসপোর্ট হাতে নিয়ে উপরের ধাপগুলো অনুসরণ করলে আপনি ঘরে বসেই নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারবেন। কার্ডটি সংগ্রহের পরের ধাপ হলো ট্রেনিং শিডিউল ও PDO ভর্তি—সঠিক তথ্য জেনে এগোলে আপনার নিরাপদ ও বৈধ বিদেশ যাত্রার পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
বি.দ্র.: সরকারি ফি, ওয়েব ঠিকানা ও প্রক্রিয়া সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। আবেদনের আগে অবশ্যই অফিশিয়াল BMET/OEP পোর্টালে হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে নিন।
Leave a Reply