দোকানে গিয়ে “ভাই, ভালো একটা রাউটার দেন” বললে যা হয়, বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে সেটাই হয়। দোকানদার একটা বাক্স ধরিয়ে দেন, দাম শুনে মনে হয় ঠিকই আছে, বাসায় এনে লাগানোর পর দেখা যায় পাশের ঘরে গেলেই সিগন্যাল অর্ধেক।
কিংবা উল্টোটা। কেউ কেউ পাঁচ হাজার টাকার রাউটার কিনে বসে থাকেন, অথচ তার লাইনের স্পিড দশ এমবিপিএস। টাকাটা পুরোই জলে।
রাউটার এমন একটা জিনিস যেটা চার-পাঁচ বছর ব্যবহার করবেন। একবার ভুল করলে ভোগান্তিও চার-পাঁচ বছরের। তাই কেনার আগে কয়েকটা জিনিস নিজে বুঝে নেওয়া দরকার, দোকানদারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে।
রাউটার কেনার আগে এক নজরে যা যা দেখবেন
তাড়া থাকলে এই তালিকাটাই যথেষ্ট। বিস্তারিত নিচে আছে।
- আপনার ইন্টারনেট প্যাকেজের স্পিড কত, কারণ রাউটার এর চেয়ে বেশি স্পিড বানাতে পারে না
- অনু (ONU) লাগবে কি না, ফাইবার লাইন হলে লাগবেই
- ওয়াই-ফাই স্ট্যান্ডার্ড, ২০২৬ সালে কমপক্ষে AC, সম্ভব হলে AX
- ব্যান্ড, এক রুম হলে সিঙ্গেল, ফ্ল্যাট হলে ডুয়াল
- বাসার আয়তন ও দেয়ালের ধরন
- একসাথে কয়টা ডিভাইস চলবে
- গিগাবিট ল্যান পোর্ট আছে কি না
- WPA3 সাপোর্ট ও ফার্মওয়্যার আপডেট
- মিনি ইউপিএসে চলবে কি না (লোডশেডিংয়ের জন্য)
- অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি, স্টিকার ওয়ারেন্টি নয়
আপনার লাইনটা আসলে কী ধরনের, সেটা আগে জানুন
রাউটার কেনার আগের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটা রাউটার নিয়ে নয়, আপনার ইন্টারনেট লাইন নিয়ে। বাংলাদেশে ঘরে ইন্টারনেট আসে মূলত দুইভাবে, আর দুটোর জন্য দুই রকম প্রস্তুতি লাগে।
ফাইবার অপটিক লাইন হলে আপনার লাগবে একটা অনু, ইংরেজিতে যাকে বলে ONU বা Optical Network Unit. এটি একটা ছোট বাক্স, যা ফাইবার ক্যাবলের আলোর সিগন্যালকে সাধারণ নেটওয়ার্ক সিগন্যালে বদলে দেয়। অনু থেকে ল্যান ক্যাবল দিয়ে রাউটারে সংযোগ যায়, তারপর রাউটার সেটাকে ওয়াই-ফাই বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়। অনু ছাড়া ফাইবার লাইনে রাউটার একা কিছুই করতে পারবে না।
সাধারণ ক্যাট-সিক্স ক্যাবলে লাইন এলে অনু লাগে না। আইএসপির ক্যাবল সরাসরি রাউটারের WAN পোর্টে ঢুকিয়ে দিলেই হলো।
এখানে একটা জিনিস অনেকে জানেন না। বাজারে এমন অনু পাওয়া যায় যেগুলোর ভেতরেই ওয়াই-ফাই আছে। একে বলে ONU রাউটার। ছোট এক বা দুই রুমের বাসায় এটা দিয়েই কাজ চলে যায়, আলাদা রাউটার লাগে না। কিন্তু এগুলোর ওয়াই-ফাই সাধারণত দুর্বল, কভারেজ কম, আর সেটিংসের সুযোগও সীমিত। ফ্ল্যাটবাড়ির জন্য আলাদা রাউটার নেওয়াই ভালো।
আইএসপি “ফ্রি রাউটার” দিলে কী করবেন
অনেক আইএসপি লাইন নেওয়ার সময় একটা রাউটার দিয়ে দেয়। সেটা সাধারণত সবচেয়ে সস্তা N300 মডেল, এবং সেটা তাদের সম্পত্তি, লাইন কাটলে ফেরত দিতে হয়।
এই রাউটার দিয়ে শুরু করতে সমস্যা নেই। কিন্তু যদি দেখেন পাশের ঘরে সিগন্যাল থাকে না, বা পাঁচটার বেশি ডিভাইস দিলে নেট থেমে যায়, তাহলে বুঝবেন সময় এসেছে। তখন নিজের রাউটার কিনে আইএসপির বক্সটাকে ব্রিজ মোডে দিয়ে দিলেই চলে। আপনার লাইনে PPPoE লাগে কি না, ইউজারনেম-পাসওয়ার্ড কী, এটা আগে থেকে আইএসপির কাছ থেকে জেনে রাখুন। নতুন রাউটার সেট করার সময় এই তথ্যটাই সবচেয়ে বেশি দরকার হয়।
দামি রাউটার কিনলেই কি নেট ফাস্ট হবে?
না। এবং এই একটা ভুল ধারণার কারণেই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি টাকা নষ্ট হয়।
আপনার আইএসপি যদি ২০ এমবিপিএসের প্যাকেজ দেয়, তাহলে দুই হাজার টাকার রাউটারেও আপনি ২০ পাবেন, আট হাজার টাকার রাউটারেও ২০-ই পাবেন। রাউটার ইন্টারনেট বানায় না, শুধু বিলি করে। বাক্সের গায়ে লেখা AC1200 বা AX3000 সংখ্যাটা হলো রাউটার আর আপনার ফোনের মধ্যে সর্বোচ্চ কত গতিতে ডেটা যেতে পারে তার হিসাব, ইন্টারনেটের গতি নয়।
তাহলে ভালো রাউটারে লাভ কী? লাভ তিন জায়গায়:
- কভারেজ, দূরের ঘরেও সিগন্যাল পৌঁছায়
- স্থিতিশীলতা, দশটা ডিভাইস একসাথে চললেও ভিডিও কল আটকায় না
- লোকাল স্পিড, ফোন থেকে ল্যাপটপে ফাইল পাঠানো বা টিভিতে কাস্ট করা দ্রুত হয়
সহজ নিয়ম ধরুন: প্যাকেজ ৩০ এমবিপিএসের নিচে হলে ভালো মানের AC1200 রাউটারই যথেষ্ট। ৫০ এমবিপিএস বা তার বেশি হলে, আর ঘরে দশটার বেশি ডিভাইস থাকলে, তখন Wi-Fi 6-এর দিকে যাওয়ার মানে আছে।
ওয়াই-ফাই স্ট্যান্ডার্ড: N, AC না AX
স্ট্যান্ডার্ড মানে রাউটারটা কোন প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বাক্সে লেখা থাকে 802.11n বা 802.11ac বা 802.11ax. এখন সহজ নামও চালু হয়েছে।
| স্ট্যান্ডার্ড | চলতি নাম | ব্যান্ড | কাদের জন্য |
|---|---|---|---|
| 802.11n (N300) | Wi-Fi 4 | শুধু ২.৪ গিগাহার্টজ | এক রুম, ২ থেকে ৪ ডিভাইস, ১৫ এমবিপিএসের কম লাইন |
| 802.11ac (AC1200) | Wi-Fi 5 | ২.৪ ও ৫ গিগাহার্টজ | সাধারণ ফ্ল্যাট, ৫ থেকে ১০ ডিভাইস, বেশিরভাগ পরিবারের জন্য সেরা ভ্যালু |
| 802.11ax (AX1500, AX3000) | Wi-Fi 6 | ২.৪ ও ৫ গিগাহার্টজ | বড় ফ্ল্যাট, ১০-এর বেশি ডিভাইস, গেমিং, হোম অফিস |
২০২৬ সালে এসে N300 রাউটার নতুন করে কেনার পক্ষে যুক্তি খুব কমই আছে। দাম বাঁচে বড়জোর পাঁচশ টাকা, কিন্তু দুই বছর পরেই আপনাকে আবার কিনতে হবে।
আরেকটা কথা প্রায়ই ভুলভাবে লেখা হয়। অনেক জায়গায় দেখবেন লেখা আছে Wi-Fi 6 রাউটার মানেই পনেরো থেকে চল্লিশ হাজার টাকার জিনিস। এটা এখন আর সত্যি নয়। আগস্ট ২০২৬-এ বাংলাদেশের বাজারেই Cudy WR1500 বা Tenda TX2L Pro-এর মতো AX1500 রাউটার তিন হাজার টাকার আশপাশে পাওয়া যাচ্ছে। Wi-Fi 6 এখন আর বিলাসিতা নয়।
Wi-Fi 7 নিয়ে এখনই মাথা ঘামানোর দরকার নেই। দাম অনেক বেশি, আর দেশের সাধারণ ব্রডব্যান্ড স্পিডে এর কোনো সুবিধাই আপনি টের পাবেন না।
সিঙ্গেল, ডুয়াল না ট্রাই ব্যান্ড
ব্যান্ড মানে রাউটার কয়টা আলাদা ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে।
সিঙ্গেল ব্যান্ড শুধু ২.৪ গিগাহার্টজে চলে। এই ফ্রিকোয়েন্সি দেয়াল ভেদ করে দূরে যেতে পারে ভালো, কিন্তু গতি কম। আর সমস্যা হলো, আপনার আশপাশের সব প্রতিবেশীর রাউটার, ব্লুটুথ স্পিকার, এমনকি মাইক্রোওয়েভ ওভেনও এই একই ফ্রিকোয়েন্সিতে চলে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এতে নেট ঝুলে যায়।
ডুয়াল ব্যান্ড ২.৪ আর ৫ গিগাহার্টজ দুটোই দেয়। ৫ গিগাহার্টজে গতি অনেক বেশি, ভিড় কম, কিন্তু দেয়াল পেরোতে পারে কম। মজাটা হলো আপনি ভাগ করে নিতে পারবেন। স্মার্ট টিভি আর ল্যাপটপ ৫ গিগাহার্টজে, দূরের ঘরের ফোন আর আইপি ক্যামেরা ২.৪-এ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিবারের জন্য এটাই সঠিক পছন্দ।
ট্রাই ব্যান্ড নেওয়ার দরকার তখনই, যখন একসাথে পনেরো-বিশটা ডিভাইস চলে। সাধারণ ফ্ল্যাটে এটা টাকার অপচয়।
বাসার আয়তন আর দেয়াল: কভারেজের আসল হিসাব
রাউটারের কভারেজ নিয়ে বিজ্ঞাপনে যা লেখা থাকে, সেটা খোলা মাঠের হিসাব। আপনার বাসায় দেয়াল আছে, আর দেয়ালই আসল শত্রু।
ইটের দেয়াল সিগন্যাল অনেকটা কমিয়ে দেয়। আরসিসি ঢালাই বা কংক্রিটের কলাম আরও বেশি কমায়। আয়না, স্টিলের আলমারি, পানির ট্যাংক, এমনকি বড় ফ্রিজও সিগন্যাল আটকে দিতে পারে।
মোটামুটি ধরে নিতে পারেন:
- ৮০০ বর্গফুট পর্যন্ত, সব ঘর কাছাকাছি: একটা ভালো ডুয়াল ব্যান্ড রাউটারই যথেষ্ট
- ১০০০ থেকে ১৪০০ বর্গফুট, লম্বা করিডোরওয়ালা ফ্ল্যাট: রাউটার মাঝখানে বসাতে পারলে একটাতেই চলবে, না পারলে দ্বিতীয় ইউনিট লাগবে
- ১৫০০ বর্গফুটের বেশি বা দোতলা-তিনতলা বাড়ি: এক রাউটারে হবে না, মেশ বা দ্বিতীয় অ্যাক্সেস পয়েন্ট লাগবে
রাউটার বসানোর জায়গাটাও অর্ধেক কাজ করে দেয়। মেঝেতে বা টেবিলের নিচে না রেখে পাঁচ-ছয় ফুট উঁচুতে, ঘরের মাঝামাঝি খোলা জায়গায় রাখুন। জানালার একদম গায়ে রাখলে সিগন্যালের বড় অংশ বাইরে চলে যায়, আপনার কোনো কাজে আসে না। [[LINK: wifi-speed-baranor-upay]]
মেশ, এক্সটেন্ডার নাকি ক্যাবল টেনে দ্বিতীয় রাউটার
বড় বাসার সমাধান তিনটা, আর তিনটার ফলাফল তিন রকম।
ওয়াই-ফাই এক্সটেন্ডার বা রিপিটার সবচেয়ে সস্তা, কিন্তু সবচেয়ে দুর্বল সমাধান। এটা মূল রাউটারের সিগন্যাল ধরে আবার ছড়ায়, ফলে স্পিড প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। আর আলাদা নেটওয়ার্কের নাম তৈরি হয় বলে ঘুরে বেড়ানোর সময় ফোন নিজে থেকে বদলায় না। খুব দরকার না হলে এড়িয়ে যান।
মেশ সিস্টেম সবচেয়ে আরামদায়ক। দুটো বা তিনটা ইউনিট মিলে একটাই নেটওয়ার্ক বানায়, আপনি ঘর থেকে ঘরে গেলে ফোন নিজেই সবচেয়ে কাছের ইউনিটে চলে যায়। TP-Link Deco সিরিজের এক-প্যাক ইউনিট এখন দুই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় পাওয়া যায়, পরে আরেকটা যোগ করে নেওয়া যায়।
ল্যান ক্যাবল টেনে দ্বিতীয় রাউটার সবচেয়ে ভালো ফল দেয়, যদি বাসা বানানোর সময় বা টাইলসের কাজের সময় ক্যাবল টানার সুযোগ থাকে। এতে স্পিড একটুও কমে না। খরচও কম, শুধু ক্যাবল আর একটা সাধারণ রাউটার।
প্রসেসর আর মেমোরি: বাক্সে যেটা লেখা থাকে না
রাউটারের ভেতরেও ছোট একটা কম্পিউটার থাকে। সেটার প্রসেসর আর র্যাম যত ভালো, একসাথে তত বেশি ডিভাইস সামলাতে পারে।
ব্যাপারটা টের পাওয়া যায় তখনই, যখন ঘরে ডিভাইসের সংখ্যা বাড়ে। চারজনের পরিবারে এখন সহজেই থাকে চারটা ফোন, দুইটা ল্যাপটপ, একটা স্মার্ট টিভি, দুটো সিসি ক্যামেরা, একটা স্মার্ট ওয়াচ। এগারোটা ডিভাইস। সস্তা রাউটারের সিঙ্গেল কোর প্রসেসর আর ৩২ মেগাবাইট র্যাম এই চাপে হাঁপিয়ে যায়, ফলে নেট চলতে চলতে হঠাৎ আটকে যায়, রাউটার রিস্টার্ট দিতে হয়।
সমস্যা হলো, নামী ব্র্যান্ডগুলো এই তথ্য স্পেসিফিকেশনে দিলেও সস্তা মডেলে প্রায়ই লেখা থাকে না। লেখা না থাকা মানেই ধরে নিতে পারেন জিনিসটা ভালো নয়। কেনার আগে মডেল নম্বর দিয়ে গুগলে সার্চ করে ব্র্যান্ডের অফিসিয়াল স্পেক পেজটা একবার দেখে নিন।
বাক্সের গায়ের সংখ্যা যেভাবে আপনাকে ধোঁকা দেয়
কিছু জিনিস দোকানে বিক্রির জন্য বলা হয়, বাস্তবে যার মানে আলাদা।
“৩০০ এমবিপিএস” লেখা মানে ৩০০ পাওয়া যাবে না। এই সংখ্যাটা গবেষণাগারের আদর্শ পরিস্থিতির হিসাব, একদম পাশে বসে, কোনো বাধা ছাড়া। বাস্তবে এর অর্ধেক পেলেই ভালো।
“AC1200” মানে ১২০০ এমবিপিএস নয়। এটা দুই ব্যান্ডের যোগফল, সাধারণত ৩০০ (২.৪ গিগাহার্টজ) আর ৮৬৭ (৫ গিগাহার্টজ)। আপনার ফোন একসাথে দুই ব্যান্ডে যুক্ত হতে পারে না, তাই সর্বোচ্চ ৮৬৭-ই ধরুন, আর বাস্তবে তারও কম।
বেশি অ্যান্টেনা মানেই বেশি রেঞ্জ নয়। অ্যান্টেনার সংখ্যা রেঞ্জের চেয়ে বেশি সম্পর্কিত একসাথে কয়টা ডেটা স্ট্রিম চলতে পারে তার সাথে। চারটা প্লাস্টিকের অ্যান্টেনাওয়ালা সস্তা রাউটারের চেয়ে দুটো অ্যান্টেনার ভালো রাউটার প্রায়ই বেশি ভালো কাজ করে।
“হাই রেঞ্জ রাউটার” কোনো টেকনিক্যাল শব্দ নয়। এটা দোকানের ভাষা। এর কোনো মাপ নেই, কোনো মান নেই।
পোর্ট আর ফিচার: যেগুলো সত্যিই কাজে লাগে
গিগাবিট ল্যান পোর্ট এখন গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সস্তা রাউটারে এখনো ১০০ এমবিপিএসের পোর্ট থাকে। আপনার লাইনের স্পিড যদি ১০০ ছাড়ায়, তাহলে ওই পোর্টই বাধা হয়ে দাঁড়াবে। বাক্সে “Gigabit” লেখা আছে কি না দেখে নিন।
গেস্ট নেটওয়ার্ক কাজের জিনিস। মেহমান এলে বা কাজের লোককে ওয়াই-ফাই দিতে হলে মূল পাসওয়ার্ড না দিয়ে আলাদা নেটওয়ার্ক দিতে পারবেন।
QoS বা ব্যান্ডউইথ কন্ট্রোল ছোট প্যাকেজের লাইনে খুব দরকারি। ধরুন আপনার ২০ এমবিপিএসের লাইনে আপনি অফিসের মিটিংয়ে আছেন, আর বাসার আরেকজন বড় ফাইল নামাচ্ছে। QoS থাকলে আপনি আপনার ল্যাপটপকে অগ্রাধিকার দিয়ে দিতে পারবেন, মিটিং আর কাটবে না।
প্যারেন্টাল কন্ট্রোল থাকলে বাচ্চাদের ডিভাইসে রাতে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা যায়।
USB পোর্ট সবার লাগে না। পেনড্রাইভ বা হার্ডডিস্ক লাগিয়ে ঘরের সবার জন্য ফাইল শেয়ার করতে চাইলে কাজে দেবে, নয়তো এর জন্য বাড়তি টাকা দেওয়ার দরকার নেই।
মোবাইল অ্যাপ থাকলে সেটআপ আর পাসওয়ার্ড বদলানো অনেক সহজ হয়ে যায়। যাদের টেকনিক্যাল জ্ঞান কম, তাদের জন্য এটা বড় সুবিধা।
নিরাপত্তা: WPA3 আর ফার্মওয়্যার আপডেট
রাউটারের নিরাপত্তা মানে শুধু পাসওয়ার্ড দেওয়া নয়।
এনক্রিপশন দেখুন। এখনো WPA2 দিয়ে কাজ চলে, কিন্তু নতুন রাউটার কিনলে WPA3 সাপোর্ট আছে এমনটাই নিন। এতে পাসওয়ার্ড ভাঙার চেষ্টা অনেক কঠিন হয়ে যায়।
ফার্মওয়্যার আপডেট আরও বেশি জরুরি, অথচ এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। রাউটারের সফটওয়্যারে নিরাপত্তার ফাঁক পাওয়া গেলে কোম্পানি আপডেট ছাড়ে। যে ব্র্যান্ড নিয়মিত আপডেট দেয় না, তাদের রাউটার দুই বছর পর কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়ে। কেনার আগে ব্র্যান্ডের সাপোর্ট পেজে গিয়ে দেখুন ওই মডেলের জন্য শেষ আপডেট কবে এসেছে।
আর কেনার পর প্রথম কাজ দুটো: রাউটারের নিচে স্টিকারে লেখা ডিফল্ট অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড বদলে ফেলুন, আর ওয়াই-ফাইয়ের নাম ও পাসওয়ার্ড নিজের মতো করে দিন।
লোডশেডিং: যে বিষয়টা কোনো গাইডে লেখা থাকে না
কারেন্ট গেলে ফাইবার লাইন ঠিকই থাকে, আপনার অনু আর রাউটার বন্ধ হয়ে যায়, ফলে ইন্টারনেটও চলে যায়। বাংলাদেশে এটা প্রতিদিনের বাস্তবতা।
সমাধান হলো মিনি ইউপিএস। এক থেকে দুই হাজার টাকার একটা মিনি ইউপিএস আপনার অনু আর রাউটার দুটোকেই চার থেকে ছয় ঘণ্টা চালু রাখতে পারে।
কিন্তু রাউটার কেনার সময়ই একটা জিনিস দেখে নিতে হবে: অ্যাডাপ্টারের আউটপুট কত ভোল্ট। বেশিরভাগ রাউটার ৯ ভোল্ট বা ১২ ভোল্টে চলে, আর মিনি ইউপিএসগুলোও এই দুটো আউটপুট দেয়। কিন্তু কিছু বড় বা নতুন মডেল ১২ ভোল্ট ২ অ্যাম্পিয়ার বা তার বেশি চায়, যা সব মিনি ইউপিএস দিতে পারে না।
রাউটারের অ্যাডাপ্টারের গায়ে ছোট করে লেখা থাকে, যেমন “12V 1A”। কেনার সময় ওই লেখাটা দেখে নিন, তারপর সেই অনুযায়ী মিনি ইউপিএস বাছুন। এই ছোট্ট কাজটা করলে পরে গিয়ে “আমার রাউটার তো ইউপিএসে চলে না” এই ঝামেলায় পড়তে হবে না।
ওয়ারেন্টি আর গ্রে মার্কেট: যেখানে সবচেয়ে বেশি টাকা মার যায়
বাংলাদেশে একই মডেলের রাউটার তিন জায়গায় তিন দামে পাওয়া যায়। কারণটা সাধারণত ওয়ারেন্টি।
অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি মানে ব্র্যান্ডের অনুমোদিত পরিবেশকের মাধ্যমে আসা পণ্য, যার সার্ভিস সেন্টার দেশেই আছে। TP-Link, Tenda, Netis, Cudy, Mercusys, Ruijie, এই ব্র্যান্ডগুলোর দেশে পরিবেশক আছে এবং সাধারণত দুই থেকে তিন বছরের ওয়ারেন্টি দেয়।
স্টিকার ওয়ারেন্টি মানে দোকান নিজে থেকে দেওয়া ওয়ারেন্টি। দোকান বন্ধ হয়ে গেলে বা মালিক বদলালে ওই কাগজের কোনো দাম থাকে না।
কেনার সময় যা করবেন:
- ওয়ারেন্টি কার্ড বা ইনভয়েসে দোকানের সিল ও তারিখ নিশ্চিত করুন
- “কত বছরের ওয়ারেন্টি” শুধু নয়, কোথায় সার্ভিস পাব সেটাও জিজ্ঞেস করুন
- অনলাইনে কিনলে বিক্রেতা অফিসিয়াল পরিবেশক না রিসেলার, দেখে নিন
- অস্বাভাবিক কম দাম দেখলে সন্দেহ করুন, রিফার্বিশড বা ব্যবহৃত জিনিস নতুন বলে বিক্রি হয় প্রচুর
- বাক্স খুলে অ্যাডাপ্টার, ল্যান ক্যাবল, ওয়ারেন্টি কার্ড আছে কি না দোকানেই মিলিয়ে নিন
বাজেট অনুযায়ী কোনটা নেবেন
নিচের দামগুলো আগস্ট ২০২৬-এ বাংলাদেশের অনলাইন বাজারে দেখা দাম। দোকান, স্টক আর সময়ভেদে কিছুটা কমবেশি হবে, তাই কেনার আগে মিলিয়ে নেবেন।
| বাজেট | কী পাবেন | উদাহরণ মডেল (আনুমানিক দাম) | কাদের জন্য |
|---|---|---|---|
| ১,২০০ থেকে ১,৬০০ টাকা | N300, সিঙ্গেল ব্যান্ড | Mercusys MW325R (১,২৫০), Tenda F3 (১,২৭৫), TP-Link TL-WR841N (১,৪৫০) | এক-দুই রুম, ৩-৪ ডিভাইস, খুব কম বাজেট |
| ১,৮০০ থেকে ৩,২০০ টাকা | AC1200, ডুয়াল ব্যান্ড | Tenda AC5 (১,৮৭৬), Archer C54 (১,৯৫০), Archer C64 (২,৭৫০), Archer C6 (৩,১৫০) | বেশিরভাগ পরিবারের জন্য সেরা ভ্যালু |
| ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা | Wi-Fi 6 (AX1500 থেকে AX3000) | Cudy WR1500 (৩,০০০), Tenda TX2L Pro (৩,২৫০), Archer AX12 (৩,৩৫০), Tenda TX3000 Pro (৪,২৮৫) | ১০-এর বেশি ডিভাইস, ৫০ এমবিপিএস+ লাইন, হোম অফিস |
| ২,৪০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা প্রতি ইউনিট | মেশ ইউনিট | TP-Link Deco E4 (২,৩৯০), Deco M4 (৩,৩৯৫), Ruijie EW1300G (৩,৩৪৮) | বড় ফ্ল্যাট বা দোতলা বাড়ি |
| ৫,০০০ টাকার বেশি | উচ্চ ক্ষমতার AX | TP-Link Archer AX53 (৫,২৪৯) | গেমার, ছোট অফিস, ভারী ব্যবহার |
লক্ষ্য করুন, তিন হাজার আর চার হাজার টাকার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ভালো অপশন আছে। এই রেঞ্জেই বেশিরভাগ মানুষের প্রয়োজন মিটে যায়। ৪০০০ টাকা বাজেটে সেরা ওয়্যারলেস রাউটার
আপনার জন্য কোনটা: এক নজরে সিদ্ধান্ত
| আপনার অবস্থা | যা নেবেন |
|---|---|
| ১ থেকে ২ রুমের বাসা, ১০ এমবিপিএস লাইন, ৪ ডিভাইস | ভালো একটা N300 বা সস্তা AC1200 |
| ৮০০ থেকে ১২০০ বর্গফুট ফ্ল্যাট, ২০-৩০ এমবিপিএস, ৬-১০ ডিভাইস | গিগাবিট পোর্টসহ AC1200 ডুয়াল ব্যান্ড |
| ফ্ল্যাট + হোম অফিস + স্মার্ট টিভি + সিসি ক্যামেরা, ১২+ ডিভাইস | AX1500 বা AX3000 |
| ১৫০০ বর্গফুটের বেশি বা দোতলা বাড়ি | মেশ (২ ইউনিট) অথবা ক্যাবল টেনে দ্বিতীয় রাউটার |
| শুধু ফাইবার লাইন নিয়েছেন, রাউটার নেই | অনু + আলাদা রাউটার, অথবা ছোট বাসা হলে ONU রাউটার |
| ভাড়া বাসা, ঘন ঘন বদলান | সাধারণ ডুয়াল ব্যান্ড, মেশে টাকা ঢালবেন না |
কেনার আগে শেষ চেকলিস্ট
দোকানে যাওয়ার আগে ফোনে এই তালিকাটা তুলে নিন:
- আমার প্যাকেজের স্পিড কত, তা জানা আছে
- ফাইবার লাইন হলে অনু আছে কি না, নিশ্চিত
- আইএসপির PPPoE ইউজারনেম-পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করা আছে
- বাসার আয়তন ও রাউটার কোথায় বসাব, ঠিক করা আছে
- একসাথে কয়টা ডিভাইস চলবে, গুনে দেখেছি
- ডুয়াল ব্যান্ড কি না, নিশ্চিত
- ল্যান পোর্ট গিগাবিট কি না, দেখেছি
- WPA3 আছে কি না, দেখেছি
- অ্যাডাপ্টার কত ভোল্ট, দেখে মিনি ইউপিএস মিলিয়েছি
- অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি ও সার্ভিস সেন্টার নিশ্চিত করেছি
দশটার মধ্যে আটটায় টিক দিতে পারলে ধরে নিন আপনি ঠকছেন না।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
অনু ছাড়া কি রাউটার চলবে?
ফাইবার অপটিক লাইনে চলবে না, কারণ ফাইবারের আলোর সিগন্যাল রাউটার বুঝতে পারে না, অনু সেটাকে বদলে দেয়। তবে আপনার আইএসপি যদি সাধারণ ল্যান ক্যাবলে লাইন দেয়, তাহলে অনু লাগবে না।
২০২৬ সালে কত টাকার রাউটার কেনা উচিত?
বেশিরভাগ পরিবারের জন্য দুই থেকে তিন হাজার টাকার একটা AC1200 ডুয়াল ব্যান্ড রাউটারই যথেষ্ট। লাইনের স্পিড ৫০ এমবিপিএসের বেশি হলে বা ডিভাইস দশের বেশি হলে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার টাকার Wi-Fi 6 মডেল বিবেচনা করুন।
বেশি অ্যান্টেনা মানেই কি ভালো রাউটার?
না। অ্যান্টেনার সংখ্যা রেঞ্জের সরাসরি মাপ নয়। ভেতরের প্রসেসর, চিপসেট আর স্ট্যান্ডার্ড অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই অ্যান্টেনার একটা ভালো AC রাউটার চার অ্যান্টেনার সস্তা N রাউটারের চেয়ে ভালো ফল দেয়।
রাউটার কি লোডশেডিংয়ে চালু রাখা যায়?
যায়, মিনি ইউপিএস দিয়ে। কেনার আগে রাউটারের অ্যাডাপ্টারের ভোল্ট ও অ্যাম্পিয়ার দেখে সেই অনুযায়ী মিনি ইউপিএস বাছুন। অনু আর রাউটার দুটোকেই ব্যাকআপে রাখতে হবে, নয়তো লাভ হবে না।
আইএসপির দেওয়া রাউটার বদলানো যাবে?
যাবে। নিজের রাউটার কিনে আইএসপির ডিভাইসটাকে ব্রিজ মোডে দিয়ে দিলেই হবে। তবে ওই ডিভাইস তাদের সম্পত্তি হলে ফেরত দেওয়ার শর্ত আগে জেনে নিন।
মেশ নাকি এক্সটেন্ডার, কোনটা ভালো?
মেশ ভালো। এক্সটেন্ডার সস্তা হলেও স্পিড প্রায় অর্ধেক করে ফেলে এবং আলাদা নেটওয়ার্ক তৈরি করে। বাজেট থাকলে মেশ নিন, না থাকলে ল্যান ক্যাবল টেনে দ্বিতীয় রাউটার বসানোই বেশি কার্যকর।
Note: দাম যাচাই করা হয়েছে আগস্ট ২০২৬-এ, বাংলাদেশের অনলাইন বাজারের তালিকা থেকে। বাজারদর দ্রুত বদলায়, তাই কেনার আগে বর্তমান দাম মিলিয়ে নিন।
Leave a Reply